কোনো গল্প
প্রাসঙ্গিক না অপ্রাসঙ্গিক তার উত্তর লুকিয়ে থাকে শব্দের ফাঁকে ফাঁকে, তাই আমার এই গল্প সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক | লোডশেডিং এর শহরে শেষ বিকেলের আলো যখন চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে, ক্লান্ত
পরিশ্রান্ত মানুষের ভিড়
যখন রাস্তার অলিতে গলিতে ছায়াপথ তৈরী করেছে ঠিক তখন কোনো এক উসখো খুসখো চুলের ছেলে বাসের জানলা
দিয়ে শহর দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরছে ... এই গল্প কোনো এক সেই ছেলের | কোনো এক সেই ছেলের এক আকাশ অভিমানের ...
একটু আগেই হয়ত
বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে, ভেজা চিকচিক রাস্তার আলোয় আরো একটা চকমকি আলো
চোখে এসে পরতেই চোখ গেল রাস্তার ধারে সারি সারি দোকান গুলোর দিকে | লাল, নীল, হলদে, সবুজ জড়িতে মোড়া
রাখী ঝোলানো রয়েছে দোকান গুলোতে, লাল সোনালী দড়িতে
বাঁধা এই চকমকি রঙিন ফুল গুলো কি শুধুই রাখী? নাকি একটা বন্ধন? একটা সম্পর্কের ইতিহাস? হয়ত বর্তমান ও ভবিষ্যতও | ছোটবেলায় শুনেছিলাম রাখী উত্সব নাকি কৃষ্ণের
উত্সব, এই বাংলায় নাকি কবিগুরু স্বদেশী ভাইদের হাতে
রাখী পরিয়ে এই উত্সব চালু করেন | কিন্তু ছেলেটির মন
কোনোও দিনই সেইসব কথা মানতে চায়নি, সে আজও বিশ্বাস
করে রাখী মানেই "অপু আর তার দুগ্গাদিদি" আর টিভিতে রাজেশ খান্নার গান
"মেরি প্যায়ারী বহনিয়া বনেগী দুলহনিয়া" ...
কিন্তু এই অপুর দুগ্গাদিদি কোনোও দিনই ছিল না, ছিল একটা ফটো, সেই ব্লাক এন্ড হোয়াইট ফটোর ছাপ ছাপ, ধুসর মুখের ফ্রক পরা ছোট্ট মেয়েটি কোনদিনই
বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনি | তবু কোনো একদিন পূর্নিমার সকালে সেই ছেলেটির
হাতে রাখী উঠেছিল | ছোট্ট ছেলেটির বালিঝরা ইটের চৌকোনো ঘরে তখন
হইচই ব্যাপার, যে ছেলেটি ও তার দাদারা কোনোদিন রাখী পরেনি
তাদের কে আজ তাদের বড়লোক মাসতুতো দিদি রাখী পরাতে আসবে, এটা সেই বড়লোক দিদির শখ | বাড়িতে ছেলেটির মা মাংস রান্না করলো | মাসতুতো দিদিও ঠিক সময়ে একটা চকচকে গাড়ি চেপে
উত্তর কলকাতার কোনো এক নামহীন গলির মুখে এসে দাড়ালো | ছেলেটির তখন মহা আনন্দ, দিদির দেওয়া নতুন জামা গায়ে পরে, মিষ্টি খেয়ে রাখী পড়ল | সারাটা দুপুর সে ঘুমোলো না, বাড়ির উঠোনময় খেলে বেরালো | সেদিন বিকেলে সেই মাসতুতো দিদি চলে যাবার পর খুব বৃষ্টি নেমেছিল, সে বৃষ্টি আজও নামে কিন্তু ছেলেটির জীবনে রাখী পূর্নিমা আর আসেনি
... পরে ছেলেটি মায়ের কাছে গল্প শুনেছিল যারা গরীব হয়, যাদের নিজের আপন কোনো দিদি-বোন থাকেনা তাদের জীবনে নাকি একবারই রাখী পূর্নিমা আসে |
এরপর প্রায়
অনেকগুলো বছর কেটে গেছে তাও প্রায় বছর ১৫ তো হবেই, সেই ছোট ছেলেটি আর ছোট্ট নেই, তার বালিঝরা ইটের
চৌকোনো ঘরের দেয়াল থেকে আর বালি ঝরে না, সেখানে এখন
ছেলেটির ঝা চকচকে উঁচু বাড়ি, গাড়ি ... হঠাত একদিন সেই বড়লোক মাসতুতো দিদির আবার শখ হলো সে তার ভাইদের
রাখী পরাবে, কিন্তু সেদিন ছেলেটির দাদারা তাকে ফিরিয়ে দিল ....
আজ এই গল্পটি
লিখতে বসে আমার একটা কথাই মনে হচ্ছে এই অর্কুট, ফেসবুকের দুনিয়ায় আমরা অনেকরকম সম্পর্ক গড়ে
তুলি, ভাই-বোনের সম্পর্কও ... কিন্তু সেগুলোও হয়ত
ক্ষনিকের, কোনটা হয়ত একবছর কোনটা দুবছর... সময়ের ধুলোতে
তার জৌলুস হারিয়ে যাবে নিশ্চিত |
লোডশেডিং এর শহরে আলো ফিরে এসেছে, আর সেই আলোয় মিলিয়ে গেছে রাখীর জৌলুস | রক্তের ছাপ না থাকলে রাখীর দড়ির ছাপ কোনদিন
হাতে স্পষ্ট দাগ কাটতে পারে না | সত্যিকারের
সম্পর্কে সময়ের ধুলো কোনদিন পড়তে পারে না ... এই বিশ্বাসটা নিয়ে উসখো খুসখো চুলের ছেলে টা আবার বাড়ি ফিরে আসবে | কিন্তু একটা আক্ষেপ রয়েই যাবে তার মনে...
তার এই আক্ষেপের
সাথে আমার মনের কথাটারও বড্ড মিল ~ ইস আমার যদি একটা
নিজের দিদি অথবা বোন থাকত তালে কত ভালই না হত ...
...দুদিন পর রাখী কিন্তু বেল পাকলে কাকের কি?

No comments:
Post a Comment